হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর মার্কিন বাণিজ্য নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে আগে থেকে সতর্ক ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। যে কারণে অঞ্চলটির নেতারা একাধিক বিকল্প সামনে রেখে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। এর একটি হলো গুরুত্বপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিক বাণিজ্য জোটের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব। বছর দুই আগে সম্ভাব্য জোটের পরিকল্পনাটি হোঁচট খেলেও এখন পুনরুজ্জীবনে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তা ও শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিকরা। খবর এফটি।
গত ২ এপ্রিলকে ‘মুক্তি দিবস’ ঘোষণা করে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের ওপর বিপুল হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চাপিয়ে দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, অবশ্য যার বড় অংশ এখন স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু ওই ঘোষণা থেকেই ভীষণ সতর্ক ইইউ। এখন কানাডা, জাপান ও মেক্সিকোর মতো ১২টি দেশ নিয়ে গঠিত কমপ্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (সিপিটিপিপি) সঙ্গে আরো দৃঢ় সম্পর্ক গড়ার পরিকল্পনা করছে ব্রাসেলস।
এ বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও উভয় পক্ষ একটি কাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহী।’
সিপিটিপিপির সঙ্গে সম্ভাব্য অংশীদারত্ব এগিয়ে নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বর্তমান অস্থিরতা কাজে লাগিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) কী কী পরিবর্তন আনা দরকার এবং একসঙ্গে কাজ করার পথ কী হতে পারে, তা খতিয়ে দেখতে চায় উভয় পক্ষই।’
উদ্যোগটি বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ জিডিপি হিস্যাধারী অর্থনীতির ওপর ছাতার মতো কাজ করতে পারে। কর্মকর্তাদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্পর্কিত নিয়মগুলোকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। সম্ভাব্য চুক্তি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি হিসেবে কাজ করবে, যাতে বাণিজ্য পূর্ব নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে পরিচালিত হবে।
২০২৩ সালে ব্রাসেলস ও সিপিটিপিপির মধ্যে এমন একটি প্রচেষ্টা শুরু হলেও কূটনৈতিকভাবে খুব বেশি দূর এগোয়নি। ওই সময় সুইডেনের বাণিজ্য বোর্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উভয় পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি ‘বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু’ হয়ে উঠতে পারে।
সিপিটিপিপি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালে। এতে সদস্য হিসেবে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, কানাডা, চিলি, জাপান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, পেরু, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনাম। চুক্তিটি বিনিয়োগকারীদের সমান সুযোগ ও সমন্বিত পণ্য বাণিজ্য নিশ্চিত করে। ইইউ এরই মধ্যে জোটটির নয়টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে। এখন ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার পক্ষে সবচেয়ে উদ্যোগী নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও সিঙ্গাপুর। এতে জাপানেরও নীরব সমর্থন রয়েছে।
কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি দুই জোটের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে এ সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবকে আনুষ্ঠানিক সংলাপে রূপ দিতে এখনো কোনো কাঠামো তৈরি হয়নি। এর আংশিক কারণ হলো অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ নির্বাচন। সিপিটিপিপির বর্তমান প্রেসিডেন্সি দেশটির হাতে। নতুন সরকার গঠনের পর ইইউ-অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনা আবার শুরু হতে পারে, যা ইইউ-সিপিটিপিপি সংলাপের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে প্রত্যাশা কূটনীতিকদের।
চুক্তিকে দ্রুত বাস্তবায়নের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক বাণিজ্য কমিশনার ও বর্তমানে পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের সদস্য সিসিলিয়া মলমস্ট্রম। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্পষ্টভাবেই নতুন গতি এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদি চুক্তি হয়, তাহলে তা চলতি বছরই হওয়া উচিত। ইইউ সাধারণত ধীরে চলে, কিন্তু গত তিন মাসের ঘটনাপ্রবাহ দেখলেই বোঝা যায়, বাস্তবতা হলো নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য রক্ষার জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
অবশ্য চুক্তির পরিধি এখনো নির্ধারিত হয়নি। ভন ডার লিয়েন বলেন, ‘ইইউ সিপিটিপিপিতে যোগ দেয়ার কোনো পরিকল্পনা করছে না।’ সিপিটিপিপির এক কর্মকর্তা জানান, সম্ভাব্য কাঠামো হতে পারে ‘দুই-ট্র্যাক’ পদ্ধতিনির্ভর। যেখানে একদিকে মন্ত্রীরা ডব্লিউটিওর নিয়মের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবেন, অন্যদিকে ডিজিটাল বাণিজ্য ও টেকসই উন্নয়নের মতো মূল ক্ষেত্রগুলোয় নিয়মের সামঞ্জস্যতা নিয়ে সংলাপ চলবে।
এছাড়া সম্ভাব্য চুক্তিকে যেন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে দেখা না যায়, তা নিয়ে সতর্ক ইইউ। বরং ওয়াশিংটনের কিছু বাণিজ্যিক অভিযোগ যে যৌক্তিক, তা স্বীকার করেই ডব্লিউটিও সংস্কারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে চুক্তিতে।
চুক্তির সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রস্তাব হলো পণ্যের উৎপত্তিস্থল নিয়মে ‘সমন্বয়ের’ ধারণা। সাধারণ উৎপত্তিস্থল স্থানীয় হলে শুল্ক ছাড় পাওয়া যায়। সমন্বয়ের নিয়মে এটি বিস্তৃতির পরিকল্পনা করছে পক্ষগুলো। কর্মকর্তারা বলেন, এটি ইইউ ও সিপিটিপিপি দেশগুলোর কোম্পানিকে সহজে একীভূত সরবরাহ চেইন গড়তে সাহায্য করবে এবং দেশগুলোয় পণ্য আমদানি সহজ করবে।